গীতার ৭.২০ শ্লোক: কামনার বশে অন্য দেবতার উপাসনা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

13 অক্টোবর, 2026

রথে বসে অর্জুনকে উপদেশ দিচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ—শিল্পীর কল্পনায় গীতার দৃশ্য।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ২০তম শ্লোকে কামনা মানুষের জ্ঞান ও উপাসনার উদ্দেশ্যকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা আলোচনা করা হয়েছে। শ্লোকটি বোঝার সময় শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য, অধ্যায়ের প্রসঙ্গ এবং ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেঽন্যদেবতাঃ।
তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া॥৭.২০॥

এটি সংস্কৃত শ্লোকের বাংলা অক্ষরে পাঠ। এখানে ‘ঽ’ সংস্কৃতের অবগ্রহচিহ্ন।

নানা কামনায় যাঁদের জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়েছে, তাঁরা নিজ নিজ স্বভাবের দ্বারা পরিচালিত হয়ে বিভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করে অন্য দেবতাদের শরণ নেন।

এটি দুই বইয়ের অনুবাদ মিলিয়ে প্রস্তুত সহজ ভাবানুবাদ; কোনো বইয়ের বাংলা অনুবাদ হুবহু তুলে দেওয়া হয়নি। শ্লোকের “অন্য দেবতা” কথাটি এখানে বক্তা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হলে মানুষ কখনো নিজের বিচারবোধকে সেই আকাঙ্ক্ষার অধীন করে ফেলেন। তখন কী প্রার্থনা করছেন, কেন করছেন এবং জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

শ্লোকটির আলোচনায় এই কামনানির্ভর অবস্থার কথা এসেছে। শুধু বাহ্যিক নিয়ম পালন করলেই উপাসনার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায় না; অন্তরের আকাঙ্ক্ষাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষের সম্পাদিত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অনুবাদে বিভিন্ন কামনায় বিবেক আচ্ছন্ন হওয়া, নিজস্ব স্বভাবের বশে চলা এবং কাম্য ফলের জন্য অন্য দেবতার আরাধনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ-এর অনুবাদ ও তাৎপর্যে জড় কামনা এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করা হয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদের ব্যাখ্যায় সাময়িক বিষয়লাভের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি শ্রীকৃষ্ণকেন্দ্রিক বৈষ্ণব ভাষ্যের দৃষ্টিভঙ্গি। একে সব হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনা সম্পর্কে অভিন্ন ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

এই শ্লোক পাঠ করে নিজের কাছে প্রশ্ন রাখা যায়: আমার প্রার্থনা কি কেবল কিছু পাওয়ার জন্য, নাকি তার সঙ্গে আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানও যুক্ত আছে?

দৈনন্দিন প্রয়োজন থাকা স্বাভাবিক। তবে কোনো আকাঙ্ক্ষা যেন বিচারবোধকে আচ্ছন্ন না করে এবং ধর্মীয় অনুশীলনকে শুধু লাভের উপায় হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি না করে—এটি শ্লোকের আলোকে ভাবনার একটি বিষয়।

শ্লোকটি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে নির্বিচারে “জ্ঞানহীন” বলা ঠিক হবে না। কারও বাহ্যিক উপাসনা দেখে তাঁর অন্তরের উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

ধর্মীয় বক্তব্য বোঝার জন্য তার প্রসঙ্গ ও সংশ্লিষ্ট ভাষ্য পড়া প্রয়োজন। ভিন্ন উপাসনার অনুসারীদের সঙ্গে আলোচনায় সম্মান ও শালীনতা বজায় রাখা উচিত।

এই লেখার পাঠ ও আলোচনা যাচাইয়ে পাঠকের দেওয়া দুই মুদ্রিত বইয়ের পাতার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে:

১. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা — সম্পাদনায় গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ, বি.এ.; প্রকাশনায় প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী। সপ্তম অধ্যায়, শ্লোক ২০ ও বাংলা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ৯৭।

২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ, পরিমার্জিত সুলভ সংস্করণ — শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ; বাংলা অনুবাদক শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী; প্রকাশক ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট। সপ্তম অধ্যায়, শ্লোক ২০-এর পাঠ, অনুবাদ ও তাৎপর্য, পৃষ্ঠা ৪০৮–৪০৯।

বাংলা ভাবানুবাদ ও ব্যবহারিক আলোচনা ধর্মজ্যোতির পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে নিজের ভাষায় প্রস্তুত করা হয়েছে। গভীরভাবে বুঝতে সপ্তম অধ্যায়ের আগের ও পরের শ্লোক এবং সংশ্লিষ্ট ভাষ্য পাশাপাশি পড়া যেতে পারে।