শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৭তম শ্লোকে কর্তব্যকর্ম, কর্মফলের প্রতি আসক্তি এবং কর্ম থেকে বিরত থাকার প্রবণতা সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। শ্লোকটির শেষ অংশ বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন: ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগের পাশাপাশি কর্তব্যকর্ম এড়িয়ে চলার প্রতিও আসক্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে।
বাংলা অক্ষরে মূল সংস্কৃত পাঠ
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি॥২.৪৭॥
এটি সংস্কৃত শ্লোকের বাংলা অক্ষরে পাঠ, বাংলা অনুবাদ নয়। এখানে ‘ঽ’ সংস্কৃতের অবগ্রহচিহ্ন। উচ্চারণ শেখার সময় সংস্কৃতে অভিজ্ঞ গুরু বা আচার্যের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সহজ বাংলা অর্থ
তোমার অধিকার কর্তব্যকর্ম পালনে, কখনো তার ফলে নয়। নিজেকে কর্মফলের কারণ বলে মনে করো না; আবার কর্ম না করার প্রতিও আসক্ত হয়ো না।
এটি পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে প্রস্তুত সহজ ভাবানুবাদ। নিচে উল্লেখ করা দুই বইয়ের অনুবাদ মিলিয়ে এটি লেখা হয়েছে; কোনো একটি বইয়ের অনুবাদ হুবহু তুলে দেওয়া হয়নি।
দুই বইয়ের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা
গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষের সম্পাদিত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অনুবাদে কর্মফলকে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার উদ্দেশ্য না করা এবং কর্মত্যাগের দিকে ঝুঁকে না পড়ার কথা বলা হয়েছে।
শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ-এর অনুবাদে স্বধর্মবিহিত কর্মে অধিকার, নিজেকে কর্মফলের কারণ মনে না করা এবং স্বধর্ম পালন থেকে বিরত থাকার প্রতি আসক্ত না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
দ্বিতীয় বইয়ের তাৎপর্যে শাস্ত্রনির্ধারিত কর্তব্য পালন এবং ফলের প্রতি অনাসক্তির আলোচনা বিস্তৃতভাবে রয়েছে। সেখানে অর্জুনের যুদ্ধের প্রসঙ্গেও বোঝানো হয়েছে যে কর্তব্য থেকে সরে যাওয়ার প্রতি আসক্তি এই উপদেশের উদ্দেশ্য নয়।
দুই বইয়ের শব্দচয়ন ও ব্যাখ্যার ধরন এক নয়। তবে উভয় অনুবাদেই কর্মফলের প্রতি আসক্তি এবং কর্মবিমুখতা এড়িয়ে চলার শিক্ষা পাওয়া যায়।
কর্তব্যকর্ম বলতে কী বোঝায়
শ্লোকটির আলোচনায় কর্ম বলতে ইচ্ছামতো যেকোনো কাজ বোঝানো উচিত নয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ-এর শব্দার্থ ও তাৎপর্যে নির্ধারিত কর্তব্যকর্মের কথা বলা হয়েছে।
তাই এই শ্লোককে অন্যায় কাজ করার সমর্থন হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। কোন কাজ কর্তব্য, তা বোঝার জন্য গীতার প্রসঙ্গ এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনাসক্তি মানে অবহেলা নয়
কর্মফলের প্রতি অনাসক্ত থাকা এবং কাজে অবহেলা করা আলাদা বিষয়। অনাসক্তির অজুহাতে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে শ্লোকের শেষ অংশটি উপেক্ষিত হয়।
পাঠকদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য সহজভাবে বলা যায়: দায়িত্ব পালন করতে হবে যত্ন ও সততার সঙ্গে। ফল নিয়ে অতিরিক্ত আসক্তি যেন কর্তব্য পালনের মনোযোগকে আচ্ছন্ন না করে।
এটি শ্লোকের শিক্ষা নিয়ে আমাদের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা; বইয়ের আক্ষরিক অনুবাদ নয়।
দৈনন্দিন জীবনে ভাবনার একটি উদাহরণ
একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারেন, না বোঝা বিষয় জানতে চাইতে পারেন এবং ভুল সংশোধন করতে পারেন। ফল নিয়ে উদ্বেগে ডুবে থাকার পরিবর্তে প্রস্তুতির প্রতি মনোযোগ দেওয়া এই শিক্ষার একটি ব্যবহারিক উদাহরণ হতে পারে।
আবার “ফল আমার হাতে নেই, তাই পড়াশোনাও করব না”—এমন সিদ্ধান্ত কর্তব্য পালনের শিক্ষা অনুসরণ করে না।
এই উদাহরণটি ধর্মজ্যোতির পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে দেওয়া হয়েছে। এটি গীতার মূল প্রসঙ্গ বা পূর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিকল্প নয়।
সূত্র ও লেখার উদ্দেশ্য
এই লেখার পাঠ, অর্থ ও আলোচনা যাচাইয়ে পাঠকের দেওয়া নিচের দুই মুদ্রিত বইয়ের পাতার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে:
১. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা — সম্পাদনায় গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ, বি.এ.; প্রকাশনায় প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী। অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৭ ও বাংলা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ৪৪।
২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ, পরিমার্জিত সুলভ সংস্করণ — শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ; বাংলা অনুবাদক শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী; প্রকাশক ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট। সরবরাহ করা বইয়ের প্রকাশনার পাতায় অষ্টাদশ মুদ্রণ, নভেম্বর ২০২০ উল্লেখ রয়েছে। অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৭-এর পাঠ ও অনুবাদ, পৃষ্ঠা ১৪৭; সংশ্লিষ্ট তাৎপর্য, পৃষ্ঠা ১৪৮।
এই লেখার উদ্দেশ্য শ্লোকটির প্রাথমিক অর্থ সহজভাবে তুলে ধরা। আরও গভীরভাবে বুঝতে দ্বিতীয় অধ্যায়ের আগের ও পরের শ্লোক এবং সংশ্লিষ্ট ভাষ্য পাশাপাশি পড়া যেতে পারে।
